রাঙ্গামাটি ঝুলন্ত সেতুটি ঠায় দাঁড়িয়ে আছে জনমানবহীন হয়ে।

  •  
  •  
  •  
  •  

রুবেল আলম, রাঙ্গামাটি থেকে,

পর্যটকদের রাঙ্গামাটি প্রধান আকর্ষণ ঝুলন্ত সেতুটি ঠায় দাঁড়িয়ে আছে জনমানবহীন হয়ে। লেক ভ্রমণের ট্যুরিস্ট বোটগুলো সেতুর আশপাশে ভিড়িয়ে ফেলে গেছেন মালিকেরা। রাঙ্গামাটির ডিয়ার পার্ক এলাকায় ১১ মে সকালেছবি,

করোনা মহামারির কারণে চলতি ঈদের ছুটিতে সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ কারণে দেশের অন্যতম পর্যটন এলাকা রাঙ্গামাটি এই মুহূর্তে পর্যটনশূন্য।
করোনা রাঙ্গামাটির পর্যটনশিল্পকে বড় বিপর্যয়ে মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রতি মাসে চার কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো।
পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, প্রতিবছর পাহাড়ে বর্ষবরণের বৈসাবি (ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু) উৎসব ঘিরে পয়লা বৈশাখে রাঙ্গামাটিতে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ও কাপ্তাই হ্রদে মানুষের ঢল নামে। কিন্তু চলতি বছর পয়লা বৈশাখে পর্যটনকেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় রাঙ্গামাটি পর্যটকশূন্য ছিল। চলতি ঈদের ছুটিতেও সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত বছরের বৈসাবি, পয়লা বৈশাখ ও ঈদের ছুটিতেও কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। এ কারণে পর্যটন খাতের সঙ্গে দীর্ঘ বছর ধরে যুক্ত থাকা স্থানীয় কয়েকজন উদ্যোক্তা ব্যবসা গোটানোর কথা ভাবছেন।

প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত বছর করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর ১৮ মার্চ জেলা প্রশাসন সব বিনোদনকেন্দ্র, বিভিন্ন পর্যটন স্পট ও কাপ্তাই হ্রদে পর্যটকদের ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। দীর্ঘ চার মাসের বেশি বন্ধ থাকার পর গত বছরের ৩ আগস্ট সব পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়। করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় চলতি বছর ৩১ মার্চ আবার জেলা প্রশাসন পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের ঘোষণা দেয়। এখনো সব পর্যটনকেন্দ্র ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা চলছে।
পর্যটন–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, রাঙামাটি শহরে আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটের মধ্যে ঝুলন্ত সেতু, পলওয়েল পার্ক, জেলা প্রশাসক বাংলো পার্ক, রাজবাড়ি ও রাজবনবিহার উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া কাপ্তাই হ্রদে ভ্রমণ, হ্রদের দ্বীপে গড়ে ওঠা পর্যটন স্পট পেদা টিং টিং গাঙ সাবারঙ, মেজাং, সুবলং ঝরনা, চাংপাং, বড় গাঙ, ইজোর ও সাজেকে রুইলুই পর্যটনকেন্দ্র বিভিন্ন ছুটিতে পর্যটকেরা ভিড় করেন। এ সময় পর্যটক সামলাতে শত শত কর্মচারীকে হিমশিম খেতে হয়। কিন্তু চলতি ঈদের ছুটিতে পর্যটন স্পটগুলো ফাঁকা বলে ব্যবসায়ীরা জানান।

করোনার সংক্রমণের কারণে সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করায় জনমানবহীন হয়ে পড়েছে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক-রুইলুই পর্যটন এলাকাছবি,

পর্যটনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতগুলো মধ্যে রয়েছে হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট ও খাবারের দোকান, পাহাড়িদের তৈরি কাপড়ের দোকান (টেক্সটাইল) এবং নৌযান। এসব ঘিরেই মূলত রাঙ্গামাটির পর্যটন খাত। পর্যটনকেন্দ্র ও ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় এসব খাতের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার মানুষের এখন দুর্দিন চলছে।
রাঙ্গামাটি হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সূত্রে জানা গেছে, রাঙ্গামাটিতে ৫৩টি হোটেল-মোটেল রয়েছে। এসব হোটেল-মোটেলে প্রতিদিন তিন হাজারের বেশি অতিথি থাকতে পারেন। পর্যটকদের সেবা দিতে চার শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় ৮০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের কর্মীকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া দুটি হোটেল-মোটেল ও ছয়টি কটেজ রয়েছে। এসব হোটেল-মোটেল ও কটেজে ৮৬টি কক্ষ রয়েছে। অন্যদিকে বাঘাইছড়ি সাজেক ইউনিয়নের রুইলুই পর্যটনকেন্দ্রে সবচেয়ে বড় ব্যবসার খাত। শুধু সেখানেই প্রতি মাসে কমপক্ষে দুই কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে।

সাজেক–রুইলুই পর্যটনকেন্দ্রের রিসোর্ট ও কটেজ মালিক সমিতির সভাপতি সুপর্ণ দেব বর্মণ “অপরাধ অনুসন্ধানকে” বলেন, ‘আমাদের ১০৫টি রিসোর্ট-কটেজে সব কক্ষ বুকিং হলে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা আয় হয়। প্রায় দেড় মাস ধরে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। গত বছর চার মাসের বেশি বন্ধ থাকায় কমপক্ষে ৮ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় ইতিমধ্যে দুই শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে।’

করোনার সংক্রমণের কারণে সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করায় নীরব-নিস্তব্ধ পর্যটন এলাকা। লেক ভ্রমণের ট্যুরিস্ট বোটগুলো ঝুলন্ত সেতুর আশপাশে ভিড়িয়ে ফেলে গেছেন মালিকেরা। রাঙ্গামাটির ডিয়ার পার্ক এলাকায় গত ১১ মে সকালেছবি: সুপ্রিয় চাকমা

রাঙ্গামাটি তবলছড়ি এলাকায় টেক্সটাইল মার্কেটের বয়ন টেক্সটাইলের মালিক মং উচিং মারমা বলেন, ‘আমাদের টেক্সটাইল মার্কেটে অন্তত ২০ প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু পর্যটকের ওপর নির্ভরশীল। গত বছর ও চলতি পর্যটনকেন্দ্র বন্ধে আমার চারটি প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।’

রাঙ্গামাটি পর্যটনকেন্দ্রের নৌযান সমিতির সভাপতি মো. রমজান আলী বলেন, ‘আমাদের সমিতিতে ৬০টির বেশি নৌযান রয়েছে। পর্যটকদের ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা থাকায় এসব নৌযান ও কর্মচারীরা বেকার সময় পার করছেন। তাঁদের চরম অনিশ্চয়তায় মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। অনেকে পেশা বদলে অন্য পেশায় চলে গেছেন।’
রাঙ্গামাটি হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি মো. মঈন উদ্দিন সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের ৫৩টি হোটেল-মোটেল এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ইতিমধ্যে হোটেল-মোটেলে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাই করা হয়েছে। প্রতি মাসে কমপক্ষে এক কোটি টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে।’

করোনার সংক্রমণের কারণে সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করায় জনমানবহীন হয়ে পড়েছে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক-রুইলুই পর্যটন এলাকাছবি,

রাঙ্গামাটি পর্যটন কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক সৃজন বিকাশ বড়ুয়া বলেন, ‘পর্যটনকেন্দ্রের ওপর চলমান নিষেধাজ্ঞায় প্রতি মাসে ২০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। আমাদের সবচেয়ে বেশি ব্যবসা হয় পাহাড়িদের বৈসাবি উৎসব ও ঈদের ছুটিতে। গত নববর্ষ ও বৈসাবি উৎসবের সময় বন্ধ ছিল। এবার ঈদেও বন্ধ রয়েছে।’


  •  
  •  
  •  
  •