বরগুনার শিক্ষকরা বলছেন, বরাদ্দের টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও শিক্ষা অফিস থেকে শুধু শিক্ষা উপকরণ কেনার রশিদ দেওয়া হয়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •  

ক্রাইম রিপোর্টার (বরগুনা)
বরগুনার সদর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দের প্রায় এক কোটি টাকার শিক্ষা উপকরণ ও মালামালের হদিস মিলছে না। বিদ্যালয়গুলো ঘুরে দেখা গেছে, একটি বিদ্যালয়েও নেই ক্রয় দেখানো মালামাল। আছে শুধু মাল কেনার পাকা রশিদ।


শিক্ষকরা বলছেন, বরাদ্দের টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও শিক্ষা অফিস থেকে শুধু শিক্ষা উপকরণ কেনার রশিদ দেওয়া হয়েছে। অনেক শিক্ষক বলছেন, জেলা ও উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তাদের এমন দুর্নীতি ও লুটপাটের চিত্র প্রতিনিয়ত। প্রতিবাদ করলে নানা অজুহাতে সাসপেন্ড করে তাদের।

বরগুনা সদরের চরকগাছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে উন্নয়ন পরিকল্পনার সামগ্রী কেনার জন্য ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার।
এর মধ্যে বিদ্যালয়ের স্লিপ ব্যয়ের ৩টি পাকা রশিদে দেখা যায়, পাবনার জহির জাদিদ এন্টারপ্রাইজ থেকে ৭টি মুজিব কোর্ট কেনার ৩ হাজার ৫০০ টাকা, ৯টি স্টুডেন্ট কাউন্সিলর পোশাক কেনার ৪ হাজার ৫০০ টাকা, ১২টি হলদে পাখি পোশাক কেনার ৬ হাজার টাকা, ১০০টি মাস্ক ২০ টাকা দরে ২ হাজার টাকা, ১১টি স্প্রে কেনার ১৫০০ টাকা, বঙ্গবন্ধু কর্নারের জন্য বই কেনার ৩ হাজার টাকা, ১টি পাপশ কেনার ১ হাজার টাকা, ডিজিটাল থার্মোমিটার কেনার ৩ হাজার টাকা, ১টি অক্সিমিটার কেনার ১ হাজার ৫০০ টাকা, ১টি ডিজিটাল ক্লাশ টিচার কেনার ১০ হাজার টাকা মোট ৩৬ হাজার টাকার কেনাকাটা করেছে কর্তৃপক্ষ।

তবে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নরেন্দ্র সরকার “দৈনিক অপরাধ অনুসন্ধানকে” বলেন, ‘উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন উপজেলা শিক্ষা অফিসে ডেকে বরাদ্দের টাকা অথবা মালামাল না দিয়ে শুধু তিনটি পাকা রশিদ দিয়েছেন। মালামাল কেন দেওয়া হলো না শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে  জানতে চাই। এ সময় শিক্ষা কর্মকর্তা আমাকে জানিয়েছেন- ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের ৩৬ হাজার টাকা তাদের। বাকি ১৪ হাজার টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় মালামাল কিনতে হবে।’
একই অবস্থা সদরের কাটাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফুলঝুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম ধূপতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চড় ধূপতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ মনসাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ সদর উপজেলার ২২৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। সেই বিদ্যালয়ে এমন ভুয়া বিল দেওয়া হয়েছে।
কাটাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাকির হোসেন দৈনিক অপরাধ অনুসন্ধানকে বলেন, ‘উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নাছির উদ্দিন ফোন করে তার অফিসে ডেকে নিয়ে আমাকে ভুয়া ভাউচারগুলো ধরিয়ে দেন। কোনো শিক্ষা উপকরণ বা সামগ্রী না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে শিক্ষা কর্মকর্তা আমাকে চুপ থাকতে বলেন। এ নিয়ে কোনো কথা বললে আমাকে বদলী করে দেওয়ার হুমকি দেন।’

ফুলঝুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মাহতাব হোসেন “দৈনিক অপরাধ অনুসন্ধানকে” বলেন, ‘শিক্ষা কর্মকর্তা নাছির উদ্দিন এসব জাল ভাউচার দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছেন। কোনো মালামাল সরবরাহ করেননি। এ সব নিয়ে প্রতিবাদ করলে নানা অজুহাতে শাস্তি পেতে হয়।’ তাই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তারা কথা বলতে পারেন না বলে জানান ওই প্রধান শিক্ষক।

পশ্চিম ধূপতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সনজয় ভূষণ মিস্ত্রী বলেন, ‘ আমার বিদ্যালয়ে স্লিপ ব্যয়ের ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এক বছর ধরে নানা  শিক্ষা উপকরণ ও বিদ্যালয়ের ছোটোখাটো বিষয়ে আমার ২৮ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। সেই ২৮ হাজার টাকার বিল করতে চাই। কিন্তু উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নাছির উদ্দিন আমাকে অফিসে ডেকে এসব ভুয়া ভাউচার ধরিয়ে দেন। কোনো উপকরণ দেননি।’

নুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক মোশাররফ হোসেন  বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়েও এমন ভুয়া ভাউচার দিয়েছেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। আমি প্রধান শিক্ষক নাছিমা বেগমকে এসব ভাউচারে স্বাক্ষর করতে নিষেধ করেছিলাম। তারপরও তিনি স্বাক্ষর করে দিয়েছেন। এ বিদ্যালয়ের সব বরাদ্দের টাকা প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে লোপাট হয়।’
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বাড়ি পাবনা। যেসব ভাউচার বিদ্যালয়ে সরবরাহ করেছে সেসব ভাউচারও পাবনার। তিনি একাধিকার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে প্রমাণসহ লিখিতভাবে আবেদন করেছেন। তবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এম এম মিজানুর রহমানও এই লুটপাটে জড়িত। তাই কোনো ব্যবস্থা নেননি তিনি।
এসব অভিযোগের বিষয় অস্বীকার করে উপজেলার সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা সুব্রত কুমার দাস “দৈনিক অপরাধ অনুসন্ধানকে” বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা। আমরা কোনো ভাউচার প্রধান শিক্ষকদের দেইনি।’
তবে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি “দৈনিক অপরাধ অনুসন্ধানকে” বলেন, ‘আমরা কিছু ভাউচার দিয়েছি শিক্ষকদের। মালামাল কেনা হয়নি। পরে মালামাল কিনে শিক্ষকদের দিয়ে দেবো।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এম এম মিজানুর রহমান  জানান, এমন দুর্নীতির বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।
বরগুনার জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান ভুয়া এসব ভাউচার দেখে হতাশা প্রকাশ করে “দৈনিক অপরাধ অনুসন্ধানকে” বলেন, ‘পাবনা থেকে শিক্ষা উপকরণ কেনার নিয়ম নেই। তারপরও কোনো উপকরণ না কিনে পাকা রশিদে উপকরণ দেখিয়েছে। আমি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে তদন্ত করতে বলে দেবো এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলায় ২২৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্লিপ ব্যয়ের জন্য স্কুলের শিক্ষার্থীর সংখ্যার উপর ভিত্তি করে স্কুলপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা করে দুই কিস্তিতে ১ কোটি ২০ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে প্রত্যেক স্কুলে ৩৬ হাজার টাকা করে মোট ৮২ লাখ ৮ হাজার টাকার ভুয়া দেখানোর অভিযোগ আছে উপজেলা শিক্ষা অফিসের বিরুদ্ধে।


  •  
  •  
  •  
  •